কিয়ামতের আলামত: ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
কিয়ামত (End Times) সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম উভয় ধর্মে উল্লেখ রয়েছে। উভয় ধর্মগ্রন্থে কিয়ামতের দিন সম্পর্কে নির্দিষ্ট আলামত ও ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা মানবজাতিকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়। এই প্রবন্ধে, আমরা পবিত্র কুরআন, হাদিস ও বাইবেল অনুযায়ী কিয়ামতের চিহ্ন বিশদভাবে আলোচনা করবো।
১. ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কিয়ামতের আলামত
(ক) ছোট আলামত (Minor Signs)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু ছোট আলামতের কথা বলেছেন, যেগুলোর অনেকগুলো ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়েছে।
- সময় দ্রুত চলে যাবে – দিন, মাস ও বছর দ্রুত অতিক্রান্ত হবে। (বুখারী)
- অনৈতিকতা বৃদ্ধি পাবে – ব্যভিচার ও অশ্লীলতা প্রচলিত হবে। (মুসলিম)
- খুনোখুনি ও যুদ্ধ বৃদ্ধি পাবে – মানুষ নির্বিচারে হত্যা করবে। (বুখারী, মুসলিম)
- সন্তানরা বাবা-মার অবাধ্য হবে – সন্তানরা তাদের পিতামাতাকে অসম্মান করবে।
- সত্যবাদিতার অভাব হবে – মানুষ মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেবে। (ইবন মাজাহ)
- নারীর সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে – প্রতি ৫০ জন নারীর জন্য ১ জন পুরুষ থাকবে। (বুখারী, মুসলিম)
- সুদ (রিবা) ও হারাম সম্পদের প্রসার – অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে হারামকে বৈধ মনে করা হবে। (ইবন মাজাহ)
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাবে – ভূমিকম্প, প্লাবন, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি। (বুখারী)
- জ্ঞান ও আলেমদের সংখ্যা কমে যাবে – প্রকৃত আলেমরা দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। (বুখারী, মুসলিম)
- উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা হবে – সাধারণ গরিবরা বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করবে। (বুখারী, মুসলিম)
(খ) বড় আলামত (Major Signs)
১. দাজ্জালের আবির্ভাব –
- সে একচোখা প্রতারক, নিজেকে ঈশ্বর দাবি করবে।
- মিথ্যা অলৌকিক ঘটনা দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে।
- সে ৪০ দিন রাজত্ব করবে, যেখানে একটি দিন হবে এক বছরের সমান, একটি দিন এক মাসের সমান, একটি দিন এক সপ্তাহের সমান এবং বাকিগুলো স্বাভাবিক দিনের মতো হবে। (মুসলিম, তিরমিজি)
২. ঈসা (আ.)-এর প্রত্যাবর্তন –
- তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
- তিনি ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। (বুখারী, মুসলিম)
৩. ইয়াজুজ ও মাজুজ (Gog and Magog) বের হবে –
- তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। (সূরা কাহফ ১৮:৯৪-৯৮, সূরা আম্বিয়া ২১:৯৬-৯৭)
- আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন।
৪. ধোঁয়া (দুখান) দেখা যাবে –
- আকাশ থেকে একটি ধোঁয়া বের হবে, যা সবাইকে আচ্ছন্ন করবে। (সূরা আদ-দুখান ৪৪:১০-১১)
৫. দাব্বাতুল আরদ (The Beast) বের হবে –
- এটি মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণ করবে। (সূরা আন-নামল ২৭:৮২)
৬. সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে –
- এই ঘটনার পর তওবা গ্রহণ করা হবে না। (বুখারী, মুসলিম)
৭. তিনটি বড় ভূকম্পন হবে –
- একটি পূর্বদিকে
- একটি পশ্চিমদিকে
- একটি আরবে (মুসলিম)
৮. ইয়েমেন থেকে এক বিশাল আগুন বের হবে –
- এটি মানুষকে হাসরের ময়দানে (The Place of Gathering) নিয়ে আসবে। (বুখারী, মুসলিম)
৯. শিঙ্গায় (সূর) ফুৎকার দেওয়া হবে –
- প্রথমবার সব জীবিত মারা যাবে।
- দ্বিতীয়বার সব মানুষ পুনরুত্থিত হবে। (সূরা যুমার ৩৯:৬৮)
২. বাইবেলের দৃষ্টিকোণ থেকে কিয়ামতের আলামত
(ক) শেষ সময়ের চিহ্ন
১. যুদ্ধ ও সংঘর্ষ বৃদ্ধি পাবে –
- “তোমরা যুদ্ধ ও যুদ্ধের গুজব শুনবে।” (মথি ২৪:৬)
২. মিথ্যা নবী ও প্রতারক আসবে –
- অনেকে নিজেদের মসিহ দাবি করবে। (মথি ২৪:২৪)
৩. নৈতিকতার অবক্ষয় –
- মানুষ ঈশ্বরের পরিবর্তে ভোগবিলাসকে ভালোবাসবে। (২ তীমথিয়ূস ৩:১-৫)
৪. ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ ও মহামারি –
- এই দুর্যোগগুলো কিয়ামতের পূর্ববর্তী সংকেত। (লূক ২১:১১)
৫. ইঞ্জিল (Gospel) সমস্ত পৃথিবীতে প্রচারিত হবে –
- এরপরই কিয়ামত আসবে। (মথি ২৪:১৪)
(খ) বড় আলামত
১. অ্যান্টিক্রাইস্ট (Dajjal equivalent) –
- এক প্রতারক শাসক, যিনি নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করবেন। (২ থিসালোনীয় ২:৩-৪)
২. মহা দুর্যোগ (The Great Tribulation) –
- এক চরম কষ্টের সময়। (মথি ২৪:২১)
৩. যিশু খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন –
- “মানুষের পুত্রকে আকাশের মেঘের মধ্যে আসতে দেখা যাবে।” (মথি ২৪:৩০)
৪. মৃতদের পুনরুত্থান –
- “শিঙ্গা বাজানো হবে, এবং মৃতেরা পুনরুত্থিত হবে।” (১ করিন্থীয় ১৫:৫২)
৫. চূড়ান্ত বিচার –
- সৎ ব্যক্তিরা স্বর্গে প্রবেশ করবে।
- অসৎ ব্যক্তিরা অনন্ত শাস্তি ভোগ করবে। (প্রকাশিত বাক্য ২০:১২-১৫)
৬. নতুন স্বর্গ ও পৃথিবী –
- “আমি একটি নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী দেখলাম।” (প্রকাশিত বাক্য ২১:১)
৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বিষয় | ইসলাম (কুরআন ও হাদিস) | খ্রিস্টধর্ম (বাইবেল) |
---|---|---|
মিথ্যা নেতা | দাজ্জাল | অ্যান্টিক্রিস্ট |
ঈসার প্রত্যাবর্তন | দাজ্জালকে হত্যা করবেন | চূড়ান্ত বিচার করবেন |
গগ ও ম্যাগগগ | ইয়াজুজ ও মাজুজ | গগ ও ম্যাগগগ |
প্রাকৃতিক দুর্যোগ | ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ | ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ |
উপসংহার
উভয় ধর্মেই কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। সৎকর্ম করা ও সত্যের পথে থাকা – এটাই পরিত্রাণের একমাত্র পথ।
আপনার কি আরও নির্দিষ্ট কোনো বিষয় জানতে ইচ্ছে করছে?
Post Comment