কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান
কুরআনের অন্যতম বড় অলৌকিক দিক হলো এর বিজ্ঞানসম্মত উপস্থাপনা। এটি এমন এক সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে, যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত ছিল। কিন্তু তবুও কুরআনের অনেক আয়াতে এমন বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং সত্য তুলে ধরা হয়েছে, যা আধুনিক গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এ অধ্যায়ে আমরা কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করব এবং দেখব কীভাবে এটি আল্লাহর বাণী হওয়ার আরেকটি প্রমাণ।
১. বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ
কুরআনে বিশ্বজগতের সৃষ্টির ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে:
“তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে একত্রিত অবস্থা থেকে পৃথক করেছেন।” (সূরা আম্বিয়া: ৩০)
এটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব।
তাছাড়া, কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে:
“আমি নভোমণ্ডলকে শক্তিশালী করেছি এবং আমরা একে সম্প্রসারণ করছি।” (সূরা আয-জারিয়াত: ৪৭)
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল কর্তৃক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়, যা এই আয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে।
২. ভ্রূণবিজ্ঞানের নির্ভুল ব্যাখ্যা
কুরআনে মানুষের সৃষ্টির ধাপ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সাথে মিলে যায়:
“আমি মানুষকে নূতফা (তরল) থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তাকে আলাকা (জোঁকার মতো কিছু) করেছি, তারপর মুদগা (চর্বির মতো কিছু) করেছি।” (সূরা মুমিনুন: ১৪)
১৯৭০-এর দশকে অধ্যাপক কিথ মুর, একজন বিখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ, কুরআনের এই বর্ণনা দেখে মুগ্ধ হন এবং এটি আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেন।
৩. পানির উৎস এবং জীবনের প্রাথমিক অবস্থা
কুরআনে বলা হয়েছে:
“আমি প্রত্যেক জীবন্ত জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। তারা কি এখনও বিশ্বাস করবে না?” (সূরা আম্বিয়া: ৩০)
জীববিদ্যার মতে, পৃথিবীতে জীবন পানির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এবং আজও প্রতিটি জীবন্ত কোষের মৌলিক উপাদান হলো পানি।
৪. পাহাড়ের ভূমিকা
কুরআনে পাহাড় সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“আমি পৃথিবীতে পাহাড় স্থাপন করেছি যেন তা তোমাদের নিয়ে কম্পিত না হয়।” (সূরা আম্বিয়া: ৩১)
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, পাহাড় ভূত্বকের গভীরে শিকড়ের মতো কাজ করে, যা প্লেট টেকটনিক গঠনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এটি কুরআনের উক্তির সাথে সরাসরি মিলে যায়।
৫. সমুদ্রের গভীরতা ও অন্ধকার
কুরআনে সমুদ্রের গভীরতা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“তাদের কাজের দৃষ্টান্ত সেই গভীর সমুদ্রের মতো, যার উপর ঢেউয়ের পরে ঢেউ চলতে থাকে, এবং তার উপরে মেঘ। তাতে অন্ধকারের স্তর পর স্তর রয়েছে।” (সূরা নূর: ৪০)
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে গভীর সমুদ্রে আলো পৌঁছায় না এবং সেখানে স্তরভিত্তিক অন্ধকার বিরাজ করে। এটি মানুষের পক্ষে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে জানা অসম্ভব ছিল।
৬. মৌমাছির জীবনচক্র ও খাদ্য উৎপাদন
কুরআনে মৌমাছির সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর সত্য উল্লেখ রয়েছে:
“তোমার প্রভু মৌমাছিকে নির্দেশ দিয়েছেন: ‘পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষের নির্মিত স্থানে গৃহ নির্মাণ করো। তারপর প্রত্যেক ফল থেকে খাও এবং তোমার প্রভুর পথে অনুগত হয়ে চল।” (সূরা নাহল: ৬৮-৬৯)
আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, মৌমাছি নিখুঁতভাবে ফুলের নির্যাস সংগ্রহ করে মধু উৎপাদন করে, যা পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কুরআনের এই বর্ণনা এর বৈজ্ঞানিক সত্যতাকে প্রমাণ করে।
উপসংহার
কুরআনের বৈজ্ঞানিক আয়াতগুলো এমন এক যুগে প্রকাশিত হয়েছিল, যখন বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক ধারণা ছিল না। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে কুরআন শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশিকা নয়, এটি এক বিজ্ঞানভিত্তিক অলৌকিক গ্রন্থ। বিজ্ঞান যতই অগ্রসর হচ্ছে, ততই কুরআনের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আল্লাহর বাণী কেবল বিশ্বাসের জন্য নয়, জ্ঞানের আলোতেও অটল।
Post Comment