কুরআন ও বাইবেলের বিশদ তুলনামূলক বিশ্লেষণ
কুরআন ও বাইবেল উভয়ই বিশ্বধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে এগুলো ঈশ্বর/আল্লাহর প্রেরিত নির্দেশাবলী। উভয় ধর্মগ্রন্থের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ও পার্থক্য রয়েছে। এই আলোচনায় আমরা কুরআন ও বাইবেলের বিস্তারিত মিল তুলে ধরবো।
১. ঈশ্বরের ধারণা (তাওহীদ বনাম ত্রিত্ববাদ)
কুরআন:
ইসলামে তাওহীদ (একত্ববাদ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়।
- “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ চিরস্থায়ী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি।” (সুরা আল-ইখলাস ১১২:১-৩)
- “আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, পরম শাসক।” (সুরা আল-বাকারা ২:২৫৫)
বাইবেল:
খ্রিস্টধর্মে ত্রিত্ববাদ (Trinity) রয়েছে, যেখানে ঈশ্বর তিনটি সত্তায় বিদ্যমান:
১. ঈশ্বর পিতা (God the Father)
2. ঈশ্বর পুত্র (God the Son – Jesus Christ)
3. পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)
- “যীশু বললেন: ‘আমি আর পিতা এক।’” (যোহন ১০:৩০)
- “যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পিতার, পুত্রের, ও পবিত্র আত্মার নামে বাপ্তিস্ম না নাও, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়।” (মথি ২৮:১৯)
✅ মিল: উভয় ধর্মগ্রন্থই এক ঈশ্বরের ধারণা দেয়।
❌ পার্থক্য: কুরআনে আল্লাহ একক, কিন্তু বাইবেলে ঈশ্বর ত্রিত্বে বিভক্ত।
২. নবী ও বার্তাবাহকগণ
কুরআন ও বাইবেল উভয়েই একই নবীদের সম্পর্কে আলোচনা করে।
নবী | কুরআনে নাম | বাইবেলে নাম |
---|---|---|
আদম | আদম (Adam) | আদম (Adam) |
নূহ | নূহ (Nuh) | নোয়াহ (Noah) |
ইব্রাহিম | ইব্রাহিম (Ibrahim) | আব্রাহাম (Abraham) |
মুসা | মুসা (Musa) | মোজেস (Moses) |
দাউদ | দাউদ (Dawood) | ডেভিড (David) |
সুলায়মান | সুলায়মান (Sulaiman) | সলোমন (Solomon) |
ইউনুস | ইউনুস (Yunus) | যোনাহ (Jonah) |
ইয়াহইয়া | ইয়াহইয়া (Yahya) | জন (John the Baptist) |
ঈসা | ঈসা (Isa) | যীশু (Jesus) |
✅ মিল: উভয় গ্রন্থেই নবীদের ভূমিকা একই – তারা মানুষকে ঈশ্বরের পথে আহ্বান করেন।
❌ পার্থক্য: বাইবেলে যীশুকে ঈশ্বরের পুত্র বলা হয়েছে, কিন্তু কুরআনে তিনি শুধু একজন নবী।
৩. সৃষ্টি ও প্রথম মানবজাতি (আদম ও হাওয়া/ইভ)
কুরআন:
- আল্লাহ ছয় দিনে বিশ্ব সৃষ্টি করেন।
- আদম ও হাওয়া জান্নাতে থাকতেন, কিন্তু তারা একটি নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার কারণে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়।
“আর আমি আদমকে বললাম: তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যা ইচ্ছা খাও, কিন্তু এই গাছের কাছে যেও না।” (সুরা আল-বাকারা ২:৩৫)
বাইবেল:
- ঈশ্বর ছয় দিনে বিশ্ব সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম নেন।
- আদম ও ইভ ঈশ্বরের আদেশ লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার ফলে পৃথিবীতে পতিত হয়।
“প্রভু ঈশ্বর আদমকে বললেন, ‘তুমি এই গাছ থেকে খেলে তুমি অবশ্যই মরবে।’” (আদি পুস্তক ২:১৭)
✅ মিল: উভয় ধর্মগ্রন্থেই আদম ও হাওয়ার একই গল্প বিদ্যমান।
❌ পার্থক্য: বাইবেলে বলা হয়েছে যে ঈশ্বর সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিয়েছিলেন, কিন্তু কুরআনে এটি বলা হয়নি।
৪. নূহ (নোয়াহ) নবী ও মহাপ্লাবন
কুরআন:
- নূহ নবী একটি বিশাল নৌকা তৈরি করেন এবং বিশ্বাসীদের নিয়ে মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পান।
- অবিশ্বাসীরা প্লাবনে ডুবে যায়।
“আমি তাকে ও তার সঙ্গীদের নৌকায় রক্ষা করলাম এবং বাকিদের নিমজ্জিত করলাম।” (সুরা আশ-শু’আরা ২৬:১১৯-১২০)
বাইবেল:
- ঈশ্বর নোয়াহকে একটি নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন, যেখানে তার পরিবার ও পশুপাখিদের রাখা হয়।
- ৪০ দিন ৪০ রাত পানি বর্ষণ হয়।
“নোয়াহ ও তার স্ত্রী, পুত্রগণ এবং তাদের স্ত্রীগণ প্লাবনের জল থেকে বাঁচতে নৌকায় উঠলেন।” (আদি পুস্তক ৭:৭)
✅ মিল: উভয় ধর্মগ্রন্থেই মহাপ্লাবন ও নৌকার গল্প বিদ্যমান।
❌ পার্থক্য: কুরআনে বলা হয়েছে নূহের পুত্র প্লাবনে ডুবে যায়, কিন্তু বাইবেলে তিনি নৌকায় ছিলেন।
৫. ঈসা (যীশু) নবীর অলৌকিক জন্ম ও ভূমিকা
কুরআন:
- ঈসা (যীশু) নবী মারিয়ামের (মেরি) গর্ভে অলৌকিকভাবে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি মানুষকে ঈশ্বরের পথে আহ্বান করেন, কিন্তু তিনি ঈশ্বর নন।
“মারিয়াম বললেন, ‘আমি কীভাবে সন্তান ধারণ করব যখন আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি?’” (সুরা আলে ইমরান ৩:৪৭)
বাইবেল:
- যীশুকে ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
- তাকে মানবজাতির মুক্তিদাতা বলা হয়েছে।
“ঈশ্বর দুনিয়াকে এত ভালোবেসেছিলেন যে তিনি তার একমাত্র পুত্রকে পাঠিয়েছেন।” (যোহন ৩:১৬)
✅ মিল: উভয় ধর্মগ্রন্থেই ঈসার অলৌকিক জন্মের কথা বলা হয়েছে।
❌ পার্থক্য: কুরআনে ঈসা শুধুমাত্র একজন নবী, কিন্তু বাইবেলে তিনি ঈশ্বরের পুত্র।
উপসংহার
✅ কুরআন ও বাইবেল উভয়ই এক ঈশ্বর, নবীগণ, নৈতিক শিক্ষা ও আখিরাতের ধারণা দেয়।
✅ কিন্তু ঈশ্বরের প্রকৃতি, যীশুর অবস্থান, ও কিছু কাহিনীর বিবরণে পার্থক্য রয়েছে।
Post Comment